সমীর আহম্মেদ খুলনার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জগতের একজন অবিসংবাদী ব্যক্তিত্ব। প্রধানত ভাষা সৈনিক হিসেবে তিনে পরিচিত। সঙ্গে সাহিত্যিক, গীতিকার ও পত্রিকা সম্পাদক। তার জন্ম ১৯৩৫ সালের ২ জানুয়ারি কোলকাতায়। বশির আহম্মেদ তার পিতা ও আমেনা খাতুন তার মা। ১৯৪৭ সালের পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর খুলনায় চলে আসেন। এখানে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এখানে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পুনরায় সংস্কৃতি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হন। প্রথমেই নয়া সাংস্কৃতিক সংসদে যোগ দেন। এর নেতৃত্বে ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতিক এম এ গফুর।
তিনি শরীফ আমজাদ হোসেন সম্পাদিত তকবীর পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫২ সালে তার সম্পাদনায় বাগেরহাট থেকে প্রকাশিত হয় মাসিক সবুজ পত্র। মূলত এটি সাহিত্য ভিত্তিক পত্রিকা। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে সাহসী ভূমিকা পালন করে। পিকচার প্যালেস এর সামনে স্টুডিয়ো ফোকাস ছিল পত্রিকার বার্তা বিভাগ। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় মুসলিম লীগের পেটুয়া বাহিনী পত্রিকা অফিস ভাঙচুর করে। মুসলিম লীগ সরকারের রোষানলে পড়ায় পত্রিকাটি বেশিদিন প্রকাশ করা সম্ভব হয় নি। তার জীবনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেওয়া। তিনি শারীরিক নির্যাতনের স্বীকার হন। ভাষা আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য খুলনা সিটি কর্পোরেশন মেয়র পদে ভূষিত করে।
এছাড়া খুলনা জেলা প্রশাসন ভাষা সৈনিক হিসেবে ২০১১, ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে সম্মাননা প্রদান করে। ২০০৬ সালে তৈয়বুর রহমান মিউজিয়াম ও লাইব্রেরি, ২০১১ সালে বৃহত্তর উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি ও আবু মোহাম্মদ ফেরদাউস স্মৃতি সংসদ সম্মাননা ক্রেস্ট, আর্টিস্ট ক্লাব ২০১২ সালে ক্রেস্ট এবং ভাষা আন্দোলনে ৬০ বছর পূর্তিতে ২১শে চেতনা পরিষদ কর্তৃক ক্রেস্ট, ২০১৪ সালে ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘর, ২০১৭ সালে পঞ্চবিধি ক্রীড়া চক্র ভাষা সৈনিক সম্মাননা, ঢাকার ২১শে চেতনা পরিষদ, খুলনা প্রকৌশল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ২০১০ সালে সম্মাননা স্মারক, জেলা ক্রীড়া সংস্থা ২০০৯ সালে এবং ২১ এর বইমেলা, খুলনা ২০১০ সালে একই বছর মুহাম্মদ আব্দুল হালিম স্মৃতি সংসদ, কুয়েট অফিসার অ্যাসোসিয়েশন ও সম্মাননা প্রদান করেন। কৃষি ক্ষেত্রে অবদান রাখায় দুবার রাষ্ট্রপতি পদক পান। কৃষিতে অবদানের জন্য ২০০০ সালে জেনেটিক্স থেকে সম্মাননা, ২০০৫ সালে বিআইডি মাদ্রিক, স্পেনের উদ্যোগে, জেনেভা-সুইজারল্যান্ড স্বর্ণ পদক পান।
গর্বিত এই ভাষা সৈনিক খুলনায় আওয়ামী লীগ আত্মপ্রকাশের সময় সংশ্লিষ্ট ছিলেন। শুরুতেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িতরা হচ্ছেন শেখ আব্দুল আজিজ, এ্যাড. মোমিন উদ্দিন আহম্মেদ, এ্যাড. এ এইচ দেলদার আহম্মেদ ও এ্যাড. এএফএম আব্দুল জলীল।
এই ভাষা সৈনিক বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। বেতার ও চলচ্চিত্রে গান লিখে সুনাম অর্জন করেন। তার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন, মাহামুদুন নবী, শাম্মী আক্তার প্রমুখ। তার রচিত গ্রন্থের নাম ছড়ায় কবিতায়। বয়রা সাহিত্য সংসদ, বাংলাদেশ ডিবেটিং সোসাইটি ও খুলনা হেরিটেজ মিউজিয়ামের যথাক্রমে উপদেষ্টা ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।
জীবদ্দশায় কেডিএ এ্যাভিনিউস্থ নিজের অর্থে তৈরি বাড়িটির নামকরণ করেন মাতৃভাষা। মুশতারি আহম্মেদ তার স্ত্রী। তার পুত্র সাগীর আহমেদ ব্যাংকার, সাব্বির আহম্মেদ মুন্না, সাকিব আহম্মেদ ও সেলিম আহম্মেদ ব্যবসায়ী, কন্যা মমতাজ পারভিন, নাসরিন সুলতানা ও ইয়াসমিন সুলতানা গৃহিণী। তিনি ২০১৭ সালে ২ জুন ইন্তেকাল করেন। জিরোপয়েন্ট গোলচত্বরের পাশে তার নিজের প্রতিষ্ঠিত কৃষি খামার এলাকায় দাফন সম্পন্ন হয়।
খুলনা গেজেট/এনএম

